✍️By Ramiz Ali Ahmed

ছবি:দেবী চৌধুরানী
অভিনয়:প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, বিবৃতি চট্টোপাধ্যায়,অর্জুন চক্রবর্তী,সব্যসাচী চক্রবর্তী, দর্শনা বণিক,কিঞ্জল নন্দ
পরিচালনা:শুভ্রজিৎ মিত্র

পুজোর মধ্যে “দেবী চৌধুরানী” দেখার ইচ্ছে থাকলেও সময় হচ্ছিলো না একদম।মঙ্গলবার সাউথ সিটি আইনক্সে ছবির স্পেশাল স্ক্রিনিং ছিল।ইন্ডাস্ট্রির ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সকলকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করেন। পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্রের সকলকে নিয়ে ছোট্ট ভূমিকার পরে শুরু হয় ছবি। ১৮৮৪ সালের লেখা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “দেবী চৌধুরানী”র কাহিনি মোটামুটি সকলের জানা। তাই কাহিনি নিয়ে আলোচনা করে লেখা অযথা প্রলিম্বিত করবো না।শুধু এটুকু বলেরাখি এ “দেবী চৌধুরানী” শুধু বঙ্কিমচন্দ্রর ‘দেবী চৌধুরানী’ নয় সাহিত্য,জনশ্রুতি ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্রের বুনোট চিত্রনাট্যে এ “দেবী চৌধুরানী” যেন আরো জীবন্ত, যেন নারীশক্তির পরম উদযাপন।

গল্পের প্রেক্ষাপট ১৭৭০ সাল। মুঘল শাসন তখন অস্তগামী। ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার বড়লাট। সমগ্র বাংলার খুবই শোচনীয় অবস্থা।ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর ইংরেজ শাসনের অবলুপ্তি ঘটাতে হাত ধরেছেন সন্ন্যাসী-ফকিররা।ইংরেজরাও ষড়যন্ত্র করে পুরো বাংলা তথা ভারতবর্ষ অধিগ্রহনের ষড়যন্ত্র করছেন।অস্থির সময়।এরকম অস্থির সময়ে আবির্ভাব হয় এক ডাকাত সন্ন্যাসির-বলা ভালো নারী শক্তির আধারক,তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী, অস্ত্রধারী এক কালী সাধকের।এই সাধক ছিলেন গরিবের ‘রবিন হুড’-তিনি হলেন ভবানী চরণ পাঠক। আর এই চরিত্রে যিনি রূপদান করেছেন তিনি ইন্ডাস্ট্রির ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এই চরিত্রে তিনি ছাড়া আর কেউ এই মুহূর্তে রূপদান করতে পারতেন বলে মনে পড়ছে না।তার তাকানি, বাচনভঙ্গি, কথা বলা,পরিষ্কার সংস্কৃততে মন্ত্র জপ করা- তিনি ছাড়া আর কেই বা পারতেন!


৬৩তে পা দিয়েও এরকমভাবে অ্যাকশন, এরকম ফিটনেস আমাদের গায়ের লোম খাড়া করে দেয়।এ ভবানী পাঠক বাংলা ছবির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।সাউথের রজনীকান্ত, মোহনলাল, চিরঞ্জিবী, কমল হাসান, বা মামুথি যদি থেকে থাকেন বলিউডের যদি শাহরুখ, সলমন থেকে থাকেন তবে আমাদেরও আছেন ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রি’ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এরপর আরো বেশি বেশি করে অ্যাকশন ফিল্মে দেখতে পাবো এই আশা রাখি।

এবার আসা যাক দেবী চৌধুরানী ওরফে শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে।পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র’র হাত ধরে যেন অন্য এক শ্রাবন্তীর জন্ম হল।তিনি স্বপ্নসুন্দরী, ডানা কাটা পরি। তার মধ্যে যে কতটা অভিনয়ের ক্ষিদে ছিল তা ‘দেবী চৌধুরানী’তে প্রমান করেছেন। প্রফুল্ল থেকে দেবী চৌধুরানী হয়ে ওঠার লড়াই টা যেমন ছিল একটা গ্রামের কোমল স্বভাবের মিষ্টি প্রফুল্ল থেকে ডাকাত দলের সবার মা এবং সবার প্ৰিয় দেবী চৌধুরানী হয়ে ওঠা, যে লড়াইতে তিনি পেয়েছেন তার গুরুজি ভবাণী পাঠককে।তেমনি এই ছবি দিয়েই দুষ্টু,মিষ্টি শ্রাবন্তীর যেন আরেক নতুন অভিনেত্রী শ্রাবন্তীর উত্থান হল। আর এই উত্থানে তিনি গুরু হিসেবে পেয়েছেন পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্রকে।’দেবী চৌধুরানী’ শ্রাবন্তীর কেরিয়ারে মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই নিয়ে তিনবার বাংলা ছবিতে ‘দেবী চৌধুরানী’ হল। ১৯৪৯ সালে সুমিত্রা দেবী, ১৯৭৪ সালে সুচিত্রা সেন আর ২০২৫ সালে শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়। পরিচালক শুভ্রজিৎ আগের দুই দেবী চৌধুরানী থেকে শ্রাবন্তীকে আলাদা ভাবে উপস্থাপন করেছেন।তাঁদের সঙ্গে আলোচনা বা সমালোচনার কোনো জায়গা রাখেননি।এ ছবিতে শ্রাবন্তীর লুক, অ্যাকশন-এক মুহূর্তর জন্য চোখ সরানো যায় না।

অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে নজর কেড়েছেন রঙ্গরাজের চরিত্রে অর্জুন চক্রবর্তী,টলিউডের সময় এসেছে তাকে নিয়ে আরো ভাবার।

নিশির চরিত্রে বিবৃতি চট্টোপাধ্যায় সবাইকে চমকে দিয়েছেন।তিনি এই ছবির চমকপ্রদ সারপ্রাইজও বটে। কি অ্যাকশন, কি অ্যাকশনই না তিনি করেছেন।

দেবী চৌধুরানীর শ্বশুর দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদার হরবল্লভ রায় পরিচালক শুভ্রজিৎ-এর পারফেক্ট চয়েস।

ভালো লাগে চিত্রনাট্য অনুযায়ী দেবী চৌধুরানীর স্বামী ব্রজেস্বর রায়ের চরিত্রে কিঞ্জল নন্দর যথাযত অভিনয়। শ্রাবন্তীর সতীন সাগর এর চরিত্রে দর্শনাকে বেশ মিষ্টি লেগেছে। সাধক রামপ্রসাদের চরিত্রে গায়ক মনোময় ভট্টাচার্যও নজর কেড়েছেন। ভবানী পাঠককে সাহায্য করতে বিপদের সময় ঝাঁপিয়ে পড়েন মজনু শাহ। চরিত্রটি করেছেন ভরত কল।
পরিচালককে প্রশংসা করতেই হয় এরকম একটি মুহূর্ত ছবিতে তুলে ধরার জন্য। এই সম্প্রীতির বাতাবরণ বর্তমান অস্থির সময়ে খুব দরকার। সিনেমার শেষে যখন মজনু শাহর কণ্ঠে উঠে আসে ‘জয় ভৈরবী’ আর ভবানী পাঠক যখন বলে ওঠেন ‘আল্লাহু আকবর’। গোটা প্রেক্ষাগৃহে যেন এক সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরী হয়। পরিচালককে শত শত কুর্নিশ এরকম একটি সম্প্রতির নজির সিনেমাতে রাখার জন্য।বিক্রম ঘোষের অবহসঙ্গীত ও সঙ্গীত এ ছবির একটা বড় সম্পদ। প্রশংসা করতে হয় অনির্বান চট্টোপাধ্যায়ের ক্যামেরা,সোমনাথ কুন্ডুর রূপসজ্জা।প্রশংসা করতেই হয় অ্যাডিটেড মোশন পিকচার্স ও প্রযোজক অপর্ণা দাসগুপ্তকে-এত বড় স্কেলের বাংলা ছবি প্রযোজনা করার জন্য। এর আগে এত বড় বাজেটের বাংলা ছবি হয়েছে বলে মনে হয়না। সব মিলিয়ে শুভ্রজিৎ মিত্রের “দেবী চৌধুরানী” বাংলা ছবির ইতিহাসে ‘একটি কমার্শিয়াল ক্লাসিক’।

By Ramiz

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *