✍️By Ramiz Ali Ahmed

নাটক:হালুম জিন্দা হ্যায়
অভিনয় : রজতাভ দত্ত, বিন্দিয়া ঘোষ
পরিচালনা: বাপ্পা
মিউজিক: চন্দ্রদীপ গোস্বামী

বাংলা নাট্যজগতে বাদল সরকার এক বিপ্লবের নাম।বাদল সরকার ‘থার্ড থিয়েটার’ নামক ভিন্ন ধারার নাটকের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত-তা আমরা সকলেই জানি।সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের সময় প্রতিষ্ঠান বিরোধী নাটক রচনার জন্য তিনি পরিচিত হন । মঞ্চের বাইরে সাধারণ মানুষের ভেতর নাটককে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথম কাজ বাদল সরকারের । তাঁর নিজস্ব নাটক দল ‘শতাব্দী’ গঠিত হয় ১৯৭৬ সালে । ভারতে আধুনিক নাট্যকার হিসেবে হাবিব তনভীর, বিজয় তেন্ডুলকর, মোহন রাকেশ এবং গিরিশ কারনাডের পাশাপাশি বাংলায় বাদল সরকারের নামও উচ্চারিত হয় ।

তাঁর নাটকে প্রশ্ন উঠে আসে সমাজের প্রতিষ্ঠিত কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মানুষের গভীরতম অস্তিত্ব জিজ্ঞাসা নিয়ে। ঠিক সেই জায়গা থেকেই উঠে এসেছে তাঁর অন্যতম শক্তিশালী নাটক ‘বাঘ’, যা শুধুই একটি নাটক নয়—এক নিরন্তর প্রশ্ন। ‘বাঘ’ নাটকটি গড়ে উঠেছে এক বাঘ ও এক মানুষের কথোপকথনের মাধ্যমে, কিন্তু এই কথোপকথন প্রকৃত অর্থে রূপক।

এই নাটক ১৯৬৫ সালে রচিত হলেও এখনও সমসাময়িক। মানুষ বাঁচতে হলে প্রয়োজন বন্ধুর, সেই বন্ধুত্বের কথা বলে বলেছে নাটকটি।সামাজিক অবহেলা, বঞ্চনা, শিক্ষার অভাব প্রভৃতি মানুষকে পরিণত করতে পারে পশুতে। কিন্তু মানুষ তো এক অনন্ত সম্ভাবনার আধার, তাই মানবিকতার পরশে সেই মানুষই হয়তো ফিরে আসতে পারে পতনের শেষ বিন্দু থেকে। এমনই এক কাহিনি উঠে এসেছে দু’জন নারী-পুরুষের জীবনের নানা ঘটনার মাধ্যমে।

এ বং পজিটিভ নাট্যদলের প্রযোজনায় বাপ্পার সামগ্রিক পরিকল্পনায় ২৭ জুলাই ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে প্রথম মঞ্চস্থ হল বাদল সরকারের ‘বাঘ’ অবলম্বনে নাটক ‘হালুম জিন্দা হ্যায়’।বাদল সরকারের জন্ম শতবর্ষে এটি নাট্যকারের প্রতি এই দলের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।এর গল্পে দেখা যাবে, মানুষের অবহেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে এক যুবকের মধ্যে বাঘের পশুত্ব জেগে ওঠে। স্বশিক্ষিত জ্ঞানী ঐ যুবক এক ধরনের মানসিক রোগী, যে দেখে দেখে নারীদের অপহরণ করে। সেই রকমই এক নারীকে ধরে আনে কিন্তু সেই নারীও একজন চাকুরিজীবী মানুষ, সঙ্গে বিভিন্ন সমিতি করে, একজন প্রতিবাদী নারীও। গল্পে এই নারীর সঙ্গে আলাপ, তর্ক-বিতর্ক করতে করতেই ওই যুবক নারীর প্রতি এক ধরনের বন্ধুত্বের আকর্ষণ গড়ে ওঠে। এই বন্ধুত্বের মধ্যে আলাপ চলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, যুদ্ধবিরোধী, অর্থনৈতিক সংকট। ওই যুবক অঙ্কে দুর্বল ছিল, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নারী বাঘ যুবককে নিজের বন্ধুত্বের বন্ধনে জড়িয়ে ফেলে যুবকের বাঘের হিংস্রতা থেকে বের করে, বাঘের ডেরা থেকে মুক্তি পায় এবং গড়ে ওঠে এক মিষ্টি বন্ধুত্ব।

বাঘের চরিত্রে রজতাভ দত্ত এই নাটকের প্রাণ।তাঁর অভিনয়, ডায়লগ থ্রোইং,চালচলন,পাগলামি উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।শিকারের চরিত্রে বিন্দিয়া ঘোষ এই নাটকের প্রাণভোমরা,তাঁর সংবেদনশীল অভিনয়,ভয়েস এর যথাযথ প্রয়োগ সবথেকে বড়কথা রজতাভ দত্তের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় মন কাড়ে উপস্থিত দর্শকদের।তাঁদের সঙ্গে সাগর,শুভদীপ,রুপম, অনুসুয়ারা যথাযথ সঙ্গত দান করেছে।চন্দ্রদীপ গোস্বামীর সুরে সিধুর গাওয়া গান নাটকের আলাদা এক মাত্রা দান করে।মিত্রজিৎ এর গাওয়া গানটিও ভালো লাগে দর্শকদের।মুনমুনের রূপসজ্জায় চরিত্রগুলো যথাযথ হয়ে ওঠে ।নাটকটির কোরিওগ্রাফি করেছেন দেবিস্মিতা দেব।

সবমিলিয়ে বাপ্পার ‘হালুম জিন্দা হ্যায়’ নাটকটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করবে।এখানেই বাপ্পার স্বার্থকতা।পরিচালক বাপ্পা এখানেই সফল।
নাটকটির পরবর্তী অভিনয় ২৪ আগস্ট শিশির মঞ্চে।

By Ramiz

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *