✍️By Ramiz Ali Ahmed
ছবি:পুতুলনাচের ইতিকথা
পরিচালনা:সুমন মুখোপাধ্যায়
অভিনয়:আবির চট্টোপাধ্যায়, জয়া আহসান, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ,সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়
মুক্তি পেল সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় বহু প্রতীক্ষিত ছবি “পুতুলনাচের ইতিকথা”।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ক্লাসিক উপন্যাস “পুতুল নাচের ইতিকথা” ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রথমে “ভারতবর্ষ” পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসে সমাজতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে। উপন্যাসটিতে “পুতুলনাচ” একটি রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা মানুষের জীবন এবং সমাজের উপর ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের প্রভাবকে তুলে ধরে। উপন্যাসের চরিত্ররা যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো, যা তাদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়।মানুষের জীবন ও সমাজের সম্পর্ককে খুব সুন্দরভাবে বোঝানো হয়েছে, যেখানে মানুষ পরিস্থিতির শিকার হয়।
সুমন মুখোপাধ্যায় তাঁর “পুতুলনাচের ইতিকথা” ছবিতে খুব সুন্দরভাবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গাওদিয়া গ্রামের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে তাদের আশা ও হতাশার সমান্তরাল প্রবাহমানতার ছবি এঁকেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র উপন্যাস জুড়ে – পরান-কুসুম-শশী, কুমুদ-মতি, যাদব পন্ডিত-পাগলদি,সেনদিদি ইত্যাদি উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে।আর সুমন মুখোপাধ্যায় তাঁর ছবিতে এই চরিত্রগুলো জীবন্ত করে তুলেছেন। উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র শশী, স্বপ্ন ও বাস্তবকে মেলাতে না পারা এক নি:সঙ্গ চরিত্র। শশী চরিত্রটির মধ্য দিয়ে বিশ শতকের তিরিশের দশকের মধ্যবিত্ত শিক্ষিতের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ট্রাজেডি প্রকাশ পেয়েছে। এই স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভঙ্গকে আপাতভাবে নিয়তি খেলা মনে হলেও বিজ্ঞানের ছাত্র মানিক দেখালেন এ আসলে যুগক্রান্তিকালের ফসল। ভাগ্য নয় সময়ের ও মনের হাতের নিয়ামক মানুষ। মানিকের ফ্রয়েডীয় ও মার্কসীয় চেতনার অবিস্মরণীয় সৃষ্টি এই “পুতুল নাচের ইতিকথা” উপন্যাসটি।
সুমন মুখোপাধ্যায় ৯০ বছর আগের এই প্রেক্ষাপটকে কি সুন্দরভাবে করে তুলেছেন সমসাময়িক।ছবির মুখ্য চরিত্র শশী যেন আমাদের চেনা, অতি চেনা।শশীর চরিত্রে আবির চট্টোপাধ্যায় যেন একাত্ব হয়ে গেছেন।শশী চরিত্রে অনেকগুলো স্তর রয়েছে,প্রতিটি স্তরকে কি সুন্দরভাবে ছুঁয়েছেন আবির চট্টোপাধ্যায়।’শরীর শরীর শরীর, তোমার মন নেই কুসুম’ উপন্যাসের বিখ্যাত এই সংলাপ এত সুন্দরভাবে আবিরকে দিয়ে পরিচালক ডেলিভারি করিয়েছেন তা আলাদা করে প্রশংসা করতেই হয়।তার ইচ্ছাগুলো বাস্তবতা না পাওয়া,আধুনিকতা- বিজ্ঞানমনস্কতা-নাস্তিকতার সঙ্গে গ্রামীণ বিশ্বাসের দ্বন্দ,নীরবতা বেদনা,দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা শশী চরিত্রটি আমাদের মনটাকে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা করে দেয়।শশী যেন প্রতিটি বাঙালির প্রতীক।
কুসুমের চরিত্রটি রূপদান করেছেন জয়া আহসান।কুসুম একটা খোলা বইয়ের মতো।কুসুমের মন,শরীর,আত্মা সব একরকম।কুসুমের কোনো জড়তা নেই।জয়া আহসান অসম্ভব শক্তিশালী অভিনয়ে হয়ে উঠেছেন ছবির হৃৎস্পন্দন।সে গ্রামের একজন সুন্দরী যুবতী বিবাহিতা নারী, যে রহস্যময়ী ও বিচিত্র প্রকৃতির। কুসুম, পরাণের স্ত্রী। শশীর প্রতি রয়েছে তার আকর্ষণ। গ্রামীণ পটভূমিতে কুসুমের চরিত্রটি গ্রাম্য জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে, যেখানে নারী চরিত্রগুলি নানা ধরণের সামাজিক চাপের সম্মুখীন হয়।কুসুমের চরিত্রটি জীবনের জটিলতা, বিশেষ করে নারী জীবনের টানাপোড়েন ও সম্পর্কের জটিলতা ফুটিয়ে তোলে।আবিরের পাশাপাশি জয়া আহসানও এই ছবির বড় একটি সম্পদ।শশী-কুসুম এর শেষ সাক্ষাতে কুসুমের ডায়লগ- “লাল টকটকে করে তাতানো লোহা ফেলে রাখলে তাও আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যায়, যায় না? সাধ-আহ্লাদ আমার কিছু নেই, নিজের জন্যে কোনো সুখ চাই না—বাকি জীবনটা ভাত রেঁধে ঘরের লোকের সেবা করে কাটিয়ে দেব ভেবেছি—আর কোনো আশা নেই, ইচ্ছে নেই। সব ভোঁতা হয়ে গেছে ছোটবাবু। লোকের মুখে মন ভেঙে যাবার কথা শুনতাম, অ্যাদ্দিনে বুঝতে পেরেছি সেটা কী। কাকে ডাকছেন ছোটবাবু, কে যাবে আপনার সঙ্গে? কুসুম কি বেঁচে আছে? সে মরে গেছে।” -মন ছুঁয়ে যায়।
যাদব পণ্ডিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে এক পরম বিস্ময়। “পুতুল নাচের ইতিকথা”য় ছোট একটি চরিত্র যাদবব পন্ডিত। পরিসরে সীমিত হলেও চরিত্রটির আবেদন অসামান্য, এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে রহস্য, বিহ্বলতা। আপাত সহজ সরলতায় ঘেরা যাদব পণ্ডিতের জীবন। নিঃসন্তান যাদবের ঘরে পক্বকেশ বৃদ্ধা স্ত্রী পাগলাদিদি। আনন্দে সে আনন্দময়ী, হাস্যোৎফুল্ল, এক প্রকার আত্মসুখে পরিতৃপ্ত। নিজের বার্ধক্য, গৃহের বার্ধক্য, কোনোকিছুতে ভ্রুক্ষেপ নেই, সবকিছু উপেক্ষা করে অমায়িক পথচলা। সবকিছুতে সুখের ছোঁয়া, সবকিছু পরিপাটি। ‘গুছানো সংসার পাগলাদিদির। শিক্ষাসমৃদ্ধ আধুনিক ডাক্তার শশীও এ-পরিবেশে আপ্লুত হয়, হয় অভিভূত, ‘শুধু আজ নয়, এখানে আসিলেই তাহার মন জুড়াইয়া যায়।’
যাদব পণ্ডিত রথযাত্রার দিন তার মৃত্যুর তারিখ ঘোষণা করেন, যা উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়।
মৃত্যুর আগে তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি গ্রামের উন্নতির জন্য দান করে যান।তিনি উইল করে যান তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তিতে একটি হাসপাতাল হবে এবং সেই হাসপাতালের দ্বায়িত্বে থাকবেন শশী।
যাদব পণ্ডিতের মৃত্যু এবং তার উইল গ্রামের মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনে এবং শশী’র উপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করে।
উপন্যাসটিতে যাদব পণ্ডিতের চরিত্রটি স্বল্প পরিসরে এলেও, তার প্রভাব গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। তার মাধ্যমে লেখক গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, বিশ্বাস এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন।চরিত্রটি ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় যথাযথ রূপদান করেছেন।
পুতুল নাচের ইতিকথা” উপন্যাসে মতি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যদিও সে প্রধান চরিত্র নয়। মতি হারু ঘোষের মেয়ে।সিনেমাটি শুরু হয় হারু ঘোষের মৃত্যু দিয়ে।মতির বিয়ের জন্য ম্যাট্রিক পাস পাত্র দেখতে গিয়ে হারু ঘোষ বজ্রপাতে মারা যান।মতি প্রেমে পড়ে গ্রামে যাত্রা করতে আসা কুমুদের।মতি-কুমুদ পরস্পরের প্রেম সেখান থেকে বিয়ে।শশী মতিকে পছন্দ করলেও সেটা কখনও প্রকাশ করতে পারে না।গ্রামের সহজ সরল মেয়ে মতির চরিত্রে সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায় অল্প পরিসরেই দর্শকদের মন জয় করে নেন।
উপন্যাসে কুমুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যিনি শশীর বন্ধু এবং যাত্রাপালার সাথে যুক্ত।কুমুদ স্নাতকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম কিন্তু আবেগপ্রবণ, অস্থির প্রকৃতি হওয়ার জন্য কোথাও সেভাবে জায়গা করতে পারেননি।এহেন কুমুদের সঙ্গেই গ্রামের সহজ সরল মেয়ে মতির সাথে প্রেম এবং বিয়ে।কুমুদ চরিত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নির্বাচন যথার্থ।
সেনদিদি চরিত্রটিও ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যার সৌন্দর্য একসময় প্রতিটি গ্রামবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করত, কিন্তু এখন গুটিবসন্তের ক্ষতের নীচে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে।একটি চোখও কানা হয়ে গেছে। তিনি এমন একটি সমাজের প্রতীক যেখানে চেহারাকেই বেশি মূল্য দেওয়া হয়, যেখানে রোগের ক্ষতকেও অপমানের চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। তার সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।সেনদিদির চরিত্রটি উপন্যাসের গ্রামীণ পটভূমি এবং তৎকালীন সমাজের চিত্র তুলে ধরতে সহায়ক। তিনি উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহে খুব বেশি সক্রিয় নন, তবে তার উপস্থিতি গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।এই চরিত্রটি অতি নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্যা চট্টোপাধ্যায়।তিনি যে কতটা শক্তিশালী অভিনেত্রী এই ছোট্ট চরিত্রে আবার প্রমান করলেন।
শশীর বাবার চরিত্রটি হল গোপাল দাস। তিনি গ্রামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সম্পত্তি কেনাবেচা ও সুদের কারবার করেন।খুব রাশভারী মানুষ।এই চরিত্রে শান্তিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় অসাধারণ অভিনয় করেছেন।চিত্রগ্রাহক সায়ক ভট্টাচার্যর নিখুঁত দৃশ্যগ্রহণে ছবিটি হয়ে উঠেছে আরও নিখুঁত।প্রবুব্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুর এই ছবির বাড়তি পাওনা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত এই উপন্যাসকে
সুমন মুখোপাধ্যায় তাঁর পরিচালনার মুন্সিয়ানায় পর্দায় এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন প্রতিটি চরিত্র জীবন্ত চরিত্র।প্রতিটি চরিত্র খুব চেনা।এত আগের লেখা একটা উপন্যাসকে পরিচালক তাঁর দক্ষতায় করে তুলেছেন সমসাময়িক।বাংলা ছবির ইতিহাসে ছবিটি একটি উল্লেখযোগ্য ছবি হিসেবে থেকে যাবে এটা নিশ্চিত।ক্যালিডোস্কোপ এটারটেনমেন্ট প্রযোজনা সংস্থার সমীরণ দাসকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় এরকম একটি ছবি প্রযোজনা করার জন্য।

